
সিলেটি চ্যানেল ডেস্ক ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫
পাবনার ঈশ্বরদীতে মা কুকুরের অগোচরে জীবন্ত আটটি কুকুরছানাকে বাজারের ব্যাগে ভরে বস্তাবন্দি করে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনার পর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার পর অভিযুক্ত নারী নিশি রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বাদী হয়ে ‘প্রাণীকল্যাণ আইন ২০১৯’ এর ৭ ধারায় ঈশ্বরদী থানায় মামলা দায়ের করেন।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ স ম আব্দুন নূর মামলা দায়েরের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
আইনের আওতায় আসামি নিশি রহমান
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন জানান, প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় ক্ষুদ্র কৃষক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হাসানুর রহমান নয়নের স্ত্রী নিশি খাতুনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
মামলার পর রাতেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে নিশি রহমানকে গ্রেপ্তার করে।
ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার বলেন, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ঈশ্বরদী পৌর সদরের রহিমপুর গার্লস স্কুল সংলগ্ন জনৈক বিদ্যুত এন–এর চারতলা বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতে পাঠানো হবে।
মন্ত্রণালয়ের কঠোর অবস্থান—“কোনো ছাড় নেই”
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন আরও জানান, ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার ফোন করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন,
“ঘটনাটি অমানবিক। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। প্রাণী হত্যায় জড়িতদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”
এছাড়াও প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও দ্রুত মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন।
সরকারি কোয়ার্টার ছাড়ার নির্দেশ
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, কুকুরছানা হত্যার অভিযোগ ওঠার পর ক্ষুদ্র কৃষক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হাসানুর রহমান নয়নকে সোমবার (১ ডিসেম্বর) গেজেটেড কোয়ার্টার ছাড়তে লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি ও তার পরিবার মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) বিকেলে বাসা খালি করে দিয়েছেন।
অভিযুক্তের দাবি—“আমি নিজে পুকুরে ফেলিনি”
ঘটনার আগে নয়নের স্ত্রী নিশি রহমান সাংবাদিকদের বলেন,
“বাচ্চাগুলো আমাদের বাসার সিঁড়ির পাশে থাকতো। খুব ডিস্টার্ব করত। তাই বাজারের ব্যাগে ভরে পুকুরের পাশে একটি সজিনার গাছের গোড়ায় রেখে আসি। কীভাবে পুকুরে পড়েছে জানি না। আমি নিজে ছানাগুলোকে পুকুরে ফেলিনি।”
তবে অভিযোগ ও প্রমাণ বিবেচনায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনার শুরু—মা কুকুর ‘টম’-এর বাচ্চারা নিখোঁজ
দীর্ঘদিন ধরে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনের এক কোণে থাকতো ‘টম’ নামের একটি কুকুর। প্রায় এক সপ্তাহ আগে সে আটটি বাচ্চা প্রসব করে।
রোববার রাতের কোনো এক সময় ছানাগুলো নিখোঁজ হয়ে যায়। সোমবার সকাল থেকে ছানাদের খোঁজে ছুটোছুটি এবং কান্নাকাটি করতে থাকে মা কুকুর টম।
পরে উপজেলা পরিষদের কর্মচারীরা জানতে পারেন—এলাকার ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা নয়ন এবং তার স্ত্রী নিশি জীবন্ত ছানাগুলোকে বস্তায় ভরে উপজেলা পরিষদের পুকুরে ফেলে দিয়েছেন।
পুকুর থেকে উদ্ধার—‘মা কুকুরের আর্তনাদ’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাড়ির কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন,
“সোমবার সকালে নয়ন স্যার মোটরসাইকেলে বের হওয়ার সময় আমি ছানাদের কথা জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন কিছু জানেন না। তখন তার ছেলে বলে—‘আম্মু ছানাগুলোকে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দিয়েছে।’
এরপর তারা পুকুরে গিয়ে একটি বস্তা ভাসতে দেখেন। বস্তা তুলে খোলার পর দেখা যায় আটটি কুকুরছানাই মৃত।
মৃত বাচ্চাগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে মা কুকুর টম প্রচণ্ড আর্তনাদ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মীরা তাকে চিকিৎসা দেন। মঙ্গলবারও উপজেলা চত্বরে সারাদিন ধরে ছানাগুলোর খোঁজে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় কুকুরটিকে।
মঙ্গলবার দুপুরে ছানাগুলোর মরদেহ ইউএনওর বাসভবনের পাশে মাটি চাপা দেওয়া হয়।
ছবি সংগৃহীত