সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫০ পূর্বাহ্ন

রাজনগর উপজেলা পরিষদের তহবিলে কোটি টাকার অনিয়ম: তদন্তে জড়িতদের পরিচয় নিয়ে জোর গুঞ্জন

Reporter Name

সিলেটি চ্যানেল ডেস্ক
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
৩০ নভেম্বর ২০২৫

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন তহবিল থেকে বিপুল অংকের অর্থ বেহাত এবং চেক জালিয়াতির যে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সম্প্রতি সামনে এসেছে, তা প্রশাসনিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলমান তদন্তে একের পর এক নতুন তথ্য উঠে আসছে, আর সেই সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে—ঘটনাটি কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী চক্রের নেওয়া সুবিধার ফল।

এক নজরে ঘটনা

চার মাসের মধ্যে উপজেলা পরিষদের তিনটি আলাদা তহবিল থেকে প্রায় ১ কোটি ৫১ লাখ টাকার বেশি অর্থ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তেই ধরা পড়ে। এই বিপুল অর্থ আত্মসাতের মূল দায় চাপছে পরিষদের সাবেক সাঁট মুদ্রাক্ষরিক-কাম-কম্পিউটার অপারেটর অনুপ দাস এর ওপর। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিয়মিতভাবে চেক জালিয়াতি ও নথি বিকৃতি করে সরকারি তহবিল থেকে টাকা তুলে আসছিলেন।

জেলা প্রশাসকের হঠাৎ পরিদর্শনে ধরা পড়ে অনিয়ম

তৎকালীন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন ২৮ অক্টোবর রাজনগর উপজেলা পরিষদে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে ক্যাশবই, ব্যাংক হিসাব এবং নথিপত্রে একাধিক অমিল দেখতে পান। পরে তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মোসা. শাহিনা আক্তারকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।
তদন্ত শুরু হতেই বেরিয়ে আসে তহবিল তিনটির ভয়ঙ্কর চিত্র—

তহবিলভিত্তিক অনিয়ম

হাট-বাজার তহবিল: প্রায় ৮০ লাখ টাকা

রাজস্ব তহবিল: প্রায় ৪০ লাখ টাকা

উন্নয়ন তহবিল: প্রায় ৩১ লাখ টাকা

সব মিলিয়ে ১ কোটি ৫১ লাখ টাকারও বেশি অর্থ জাল চেক ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে।

জালিয়াতির কৌশল—নথি আর চেক বদলে অর্থ উত্তোলন

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, টেংরাবাজার পশুহাটের জামানত হিসেবে দেখানো ৫ লাখ টাকা কখনোই সরকারি অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি। বরং “মতিন মিয়া” নামে একজনের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়।
এ ছাড়া, আয়কর ও ভ্যাট বাবদ ইস্যুকৃত স্বল্প অংকের চেক পরিবর্তন করে লাখ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রমাণ মিলেছে।
যেমন:

৫,৪২৭ টাকার চেকে বদল করে উত্তোলন করা হয় ৮,০৫,৪২৭ টাকা

১৫,০৩২ টাকার চেকে বদলে তোলা হয় ৫,১৫,০৩২ টাকা

এসব টাকা মূলত অনুপ দাসসহ আরও কয়েকজনের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

চার মাসেই আড়াই বছরের বেতনের চেয়েও বহু গুণ বেশি অর্থ!

২০০৯ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়া অনুপ দাস ২০২৪ সালের শুরু থেকেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে তহবিল থেকে টাকা তুলছিলেন—এমন প্রমাণ মিলেছে। সেপ্টেম্বর মাসে তাকে বড়লেখা উপজেলায় বদলি করা হলেও, বদলির আগেই মূল অনিয়মগুলো করে ফেলেন তিনি।

বর্তমানে তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তিনি আত্মগোপনে থাকতে পারেন—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

পরিবারের দাবি—ফেরত দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ টাকা

অনুপ দাসের পরিবার দাবি করেছে—ঘটনার পর তারা ১ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন। বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরীও জানিয়েছেন, অনুপ দাসের স্ত্রী তাদের কাছে কিছু অর্থ পরিশোধ করেছেন।

সাবেক ইউএনওর বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন

রাজনগরের সাবেক ইউএনও আফরোজা হাবিব শাপলা জানান, আগের ইউএনওর সময় থেকেই অনুপ দাস স্বাক্ষরের পাশের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে চেকের অংক বাড়িয়ে টাকা তুলছিলেন। ২০২৪ সাল থেকেই তার প্রতারণার বিস্তারিত চিত্র দৃশ্যমান হয়।

জেলা প্রশাসকের ঘোষণা—দুদকে মামলা হচ্ছে

বর্তমান জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানিয়েছেন, ফেরত পাওয়া টাকার তথ্য তারা পেয়েছেন। তবে এই ঘটনার জন্য দুদকে মামলা করা হবে এবং প্রশাসনিক শাস্তির বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন।

একজন অনুপ দাস নাকি আরও বড় নেটওয়ার্ক?

স্থানীয়দের প্রশ্ন—এত বড় অংকের অর্থ আত্মসাৎ কি একজন কম্পিউটার অপারেটরের পক্ষে সম্ভব?
বরং অনেকেই মনে করছেন, এর পেছনে আরও একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত, যারা দীর্ঘদিন ধরে নীরবে এসব অনিয়মকে আড়াল করে আসছিলেন।
তদন্ত এগোলে এই চক্রের অন্তরালও সামনে আসবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

উপসংহার

রাজনগর উপজেলা পরিষদের তহবিল আত্মসাতের এই কাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তি বা একটি দপ্তরের নয়—এটি প্রশাসনিক দুর্বলতা, নজরদারির অভাব এবং নথি ব্যবস্থাপনার শোচনীয় চিত্র তুলে ধরেছে।
তদন্ত এখনো চলছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা—

“দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, আর জনগণের টাকা জনগণের উন্নয়নেই ব্যবহার হোক।”