
রাজনগর (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি | সিলেটি চ্যানেল
প্রকাশিত: সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫,
রাজনগর উপজেলার
তহবিলের চেক জালিয়াতির ফাইল গায়েবের অভিযোগ
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় সরকারি তহবিল সংক্রান্ত একটি চেক জালিয়াতির অভিযোগে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রশাসনের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ ওঠার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অফিসে অনুপস্থিত থাকায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. বাদশা মিয়া সম্প্রতি নিয়মিত অফিস করছেন না। তার অফিস রুমে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সরকারি তহবিলের চেক জালিয়াতি সংক্রান্ত অভিযোগ থেকে নিজেকে দায়মুক্ত রাখতে বা সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নষ্ট করতেই গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গায়েব করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
এ ঘটনায় মো. বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ঘুষ গ্রহণ, আর্থিক অনিয়ম, টেন্ডার ও ইজারা প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়া, মাঠপর্যায়ের দাপ্তরিক কাজে অবৈধ সুবিধা আদায় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
মনসুরনগর ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের সভাপতি সামছুদ্দিন অভিযোগ করেন, ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের বকেয়া বেতন ছাড়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা তার কাছে ৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। তিনি জানান, টাকা না দিলে বেতন ছাড় হবে না—এমন কথা জানানো হলে বাধ্য হয়ে তিনি অর্থ প্রদান করেন। একই ধরনের অভিযোগ গ্রাম পুলিশের আরও কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে করেছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, উপজেলার জলমহাল ইজারা, বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা প্রদান এবং কিছু ক্ষেত্রে বিসিবির ডিলারশিপ বিষয়ক কাজে আশ্বাস দিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিছু ভুক্তভোগীর দাবি, এসব ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয় নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এত অভিযোগ থাকার পরও কেন এতদিন বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
দপ্তরের তৃণমূল পর্যায়ের কয়েকজন কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, টিউবওয়েল স্থাপন, মাঠপর্যায়ের অনুমোদন ও দাপ্তরিক ফাইল দ্রুত এগিয়ে নিতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হতো। এক কর্মচারী বলেন, প্রয়োজনীয় ফাইল এগোনোর জন্য অর্থ দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প রাখা হয়নি।
এছাড়া বাজার ইজারা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রকৃত দর কম দেখিয়ে সরকারি কোষাগারে কম অর্থ জমা দিয়ে বাকি অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, সরকারি তহবিলে যেটুকু অর্থ জমা হচ্ছে না, সেই অতিরিক্ত অর্থ কোথায় যাচ্ছে—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
উপজেলা প্রশাসনের ভেতরেও অসন্তোষ রয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে সহকর্মীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে আসছেন। কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তুললে ধমক, চাপ ও হুমকির শিকার হতে হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে, যা স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবেশে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, উপজেলা চেয়ারম্যান কক্ষের দুটি এয়ারকন্ডিশনার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বাইরে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র বাইরে সরিয়ে নেওয়া এবং কিছু নথি নষ্ট করার অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো সংস্থা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
স্থানীয়দের আরেকটি অভিযোগ, সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রাজনগর এলাকায় দুই থেকে তিনটি প্লট কিনেছেন। অনেকের সন্দেহ, এসব সম্পদ অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়েও এখন পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মো. বাদশা মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ থাকায় তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে লিখিত অভিযোগ বা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পেলে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
—
তথ্যসূত্র,
Muktani Moj