
সিলেটি চ্যানেল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর ২০২৫
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস চারা ধ্বংস ও পুনর্বাসন প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে এসেছে। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রকল্পের বরাদ্দের প্রায় পুরো অংশই লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নার্সারী মালিকরা। এই কেলেঙ্কারিতে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা হাবিব শাপলার নাম উঠে এসেছে, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
প্রকল্পের বরাদ্দ ৫ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা — বাস্তবে বিতরণ মাত্র ৩০ হাজার!

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশব্যাপী আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস চারা ধ্বংসের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। রাজনগর উপজেলায় ১,৩৫০টি চারা ধ্বংসের জন্য বরাদ্দ আসে ৫ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই বরাদ্দের ৫ লক্ষ ৪ হাজার টাকাই গায়েব! মাত্র ৩০ হাজার টাকা নার্সারী মালিকদের মধ্যে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরকারি নির্দেশনার বাস্তবায়ন না হওয়ায় নার্সারীগুলোতে চারা ধ্বংস হয়নি—বরং পুরো বরাদ্দ হয়তো কাগজে-কলমে দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে ধারণা স্থানীয়দের।
সরেজমিনে নার্সারীতে গিয়ে পাওয়া গেল ভিন্ন চিত্র
অভিযোগ অনুযায়ী, নার্সারী মালিকরা কোনো ধরনের ধ্বংস নির্দেশনা বা আর্থিক সহায়তাই পাননি।
সায়েম নার্সারীর মালিক আব্দুল জব্বার জানান—
আমার নার্সারীতে ৬০ হাজার চারা আছে। আমাকে সরকারি কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। বরং কোনো কর্মকর্তা আমাদের কাছে চারা ধ্বংসের নির্দেশও দেননি।”
এই বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য নার্সারীর মালিকদের অভিজ্ঞতাও মিলে গেছে।
মাস্টাররোলে বিশাল বরাদ্দ, হাতে পাওয়া অর্থ সামান্য
অনুসন্ধানে মাস্টাররোলে দেখা যায়:
রাসেল নার্সারীর জন্য বরাদ্দ ৪ লক্ষ টাকা — মালিক শ্যামা মিয়া হাতে পেয়েছেন মাত্র ২০ হাজার
সোনার বাংলা নার্সারী — পেয়েছেন অতি সামান্য
বনফুল নার্সারী — কোনো অর্থ পাননি
ইমন নার্সারী — বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ নেই
সালাম নার্সারী — বরাদ্দ থাকলেও টাকা হাতে পাননি
এই অতিরিক্ত বরাদ্দ ও বাস্তব অর্থপ্রাপ্তির বিশাল ব্যবধান প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।
কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য: “বাস্তবায়ন করেন ইউএনওর স্টাফ অনুপ”
রাজনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন
“পুরো কার্যক্রম ইউএনও অফিসের স্টাফ অনুপ পরিচালনা করেছেন। আমাদের শুধু স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নে কৃষি অফিসের কোনো ভূমিকা নেই।”
তার এ বক্তব্য অভিযোগকে আরও বড় করে তুলেছে।
অভিযোগ অস্বীকার করলেন ইউএনও আফরোজা হাবিব শাপলা
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও আফরোজা হাবিব শাপলা বলেন
“নার্সারী মালিকদের একাউন্টে চেক দেওয়া হয়েছে। এখানে অনিয়ম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাদের অভিযোগ ভিত্তিহীন।”
তবে এর কিছুক্ষণ পরই তিনি ফোন সংযোগ কেটে দেন।
স্থানীয়রা বলছেন—যদি সত্যিই চেক দেওয়া হয়ে থাকে, তবে নার্সারী মালিকরা কেন সে টাকা পাননি?
মাত্র ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে”—নার্সারী মালিক সমিতি
রাজনগর নার্সারী মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাসেম বলেন—
৫ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকার বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা কোথায় গেল তার জবাব আমরা চাই। যদি পুরো বরাদ্দ না দেওয়া হয়, তাহলে আমরা কঠোর আন্দোলনে নামব।”
তার এই বক্তব্যে নার্সারী মালিকদের ক্ষোভের মাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে,
স্থায়ী তদন্ত দাবি করছে স্থানীয়রা
রাজনগরবাসীর অনেকেরই দাবি—
এই ঘটনা কেবল আর্থিক অনিয়মই নয়, বরং সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে পরিবেশবাদী উদ্যোগকেও ব্যাহত করা হয়েছে। এতে শুধু চারা ধ্বংস প্রকল্পই নয়, সরকারি বরাদ্দ ব্যবস্থার প্রতি জনবিশ্বাসও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ
“এটি সাধারণ দুর্নীতি নয়, এটি একটি সংগঠিত কারসাজি। পুরো ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।”
কেলেঙ্কারির ছায়া আরও গভীর হচ্ছে
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর রাজনগরে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। প্রশাসন, কৃষি দপ্তর এবং জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুরো ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা না নিলে এই কেলেঙ্কারির দায় কার ওপর পড়বে—এ প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।