
ভূমিকম্পের—৫ মিনিটের ব্যবধানে কেঁপে ওঠে সিলেট-মৌলভীবাজার অঞ্চল
প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, সিলেটি চ্যানেল ডেস্ক
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আবারও ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে। রাতের নীরবতা ভেঙে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে একের পর এক দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয় সিলেট ও মৌলভীবাজারে। ভূমিকম্প–প্রবণ এলাকার তালিকায় শীর্ষে থাকা সিলেট স্থানীয়ভাবে উৎপত্তি হওয়া এই দুই ভূমিকম্পে নতুনভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
৫ মিনিটের ব্যবধানে দুটি কম্পন
বুধবার দিবাগত রাত ২টা ৫০ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে প্রথম ভূকম্পনটি অনুভূত হয়, যার মাত্রা রিখটার স্কেলে ৩.৫। ঘরের দরজা-জানালা কেঁপে ওঠা এবং হালকা দুলুনির অনুভূতি পাওয়া যায় সিলেট মহানগরসহ বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, কানাইঘাট এলাকার বিভিন্ন স্থানে।
তার মাত্র পাঁচ মিনিট পর, রাত ২টা ৫৫ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে, দ্বিতীয় দফায় আরেকটি ভূমিকম্প ঘটে, যার মাত্রা ছিল ৩.৩। দ্বিতীয় কম্পনটি সিলেটের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের জুড়ি, বড়লেখা, কুলাউড়া ও রাজনগর এলাকাতেও অনুভূত হয়।
দুটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি বাংলাদেশেই
আবহাওয়া অফিস নিশ্চিত করেছে যে, এবার ভূমিকম্পের উৎস কোনো পার্শ্ববর্তী দেশ নয়—উভয়েরই উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশের ভেতরে।
প্রথম ভূমিকম্পের উৎস: সিলেটের বিয়ানীবাজার
দ্বিতীয় ভূমিকম্পের উৎস: মৌলভীবাজারের বড়লেখা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্প সাধারণত উদ্বেগজনক, কারণ এগুলো সক্রিয় ফল্ট লাইনের নড়াচড়ার ইঙ্গিত দেয়।
সিলেট কেন এত ঝুঁকিতে?
ভূতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চল হলো সিলেট। এর ঠিক উত্তরে ভারতের মেঘালয় বিস্তৃত, যার নিচ দিয়ে চলে গেছে ডাউকি ফল্ট লাইন—উপমহাদেশের অত্যন্ত সক্রিয় একটি ভূগর্ভস্থ ভাঙ্গন।
এছাড়াও এই অঞ্চলে রয়েছে—
সিলেট ফল্ট লাইন,
ত্রিপুরা ফল্ট লাইন,
যা একে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
এই ফল্ট লাইনগুলো টেকটোনিক প্লেটের সীমানার কাছাকাছি হওয়ায় সামান্য নড়াচড়াও ভূকম্পনের সৃষ্টি করতে পারে।
ডাউকি ফল্টের ভয়ঙ্কর ইতিহাস
১৮৯৭ সালের “বড় বৈছাল ভূমিকম্প”—রিখটার স্কেলে ৮.৩ মাত্রার—ঘটেছিল এই ডাউকি ফল্টে। সেই ভূমিকম্পে সিলেট-মেঘালয় থেকে আসাম পর্যন্ত বিশাল এলাকা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ১৩০ বছর ধরে এই ফল্ট লাইনে শক্তি জমা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মুশতাক আহমদ বলেন—
“টেকটোনিক প্লেটের বাউন্ডারি সিলেটের খুব কাছাকাছি। ডাউকি, সিলেট ও ত্রিপুরা ফল্ট যেকোনো সময় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক ছোট ভূকম্পনগুলো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাসও হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন—
“ফল্ট লাইনের অভ্যন্তরে চাপ জমতে থাকলে মাঝারি বা বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। তাই সিলেটে ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে জরুরি প্রস্তুতি—সব ক্ষেত্রেই সতর্কতা বাড়াতে হবে।”
মানুষের মধ্যে আতঙ্ক
হঠাৎ গভীর রাতে দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন হওয়ায় সিলেট-মৌলভীবাজারের অনেকেই ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে, অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাড়ছে।
একজন বাসিন্দা মন্তব্য করেন—
“এতো কম সময়ে দুইবার ভূমিকম্প খুবই অস্বাভাবিক। আল্লাহ রহম করুন।”
সরকারি পর্যায়ে সতর্কতা
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে—
ভূমিকম্পের মাত্রা কম হলেও
ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক
বিশেষ করে পাহাড়ি ও ফল্ট–কেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মতে, ভবন নির্মাণে BNBC কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা না হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।