প্রকাশের তারিখ: ২১ আগস্ট ২০২৬ সিলেটি চ্যানেল ডেস্ক
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজার থানাধীন সিলাম এলাকায় হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) মাজার ওয়াকফ এস্টেটের সম্পদ ও পরিচালনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেনসহ সাত পুলিশ সদস্য এবং উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) বেলা ১টার দিকে সিলাম চকের বাজার হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) জামে মসজিদ ও ঈদগাহের সামনে জুমার নামাজের পর এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও মুরব্বিরা হস্তক্ষেপ করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) মাজার ওয়াকফ এস্টেটের মাজার, মসজিদ এবং এর অধীন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি দোকানকোঠার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিলাম শেখপাড়া এলাকার দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মসজিদের বাইরে ওয়াকফ এস্টেটের সম্পদ ও পরিচালনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরে উভয় পক্ষের লোকজন ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
সংঘর্ষের খবর পেয়ে মোগলাবাজার থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এ সময় দুই পক্ষের হামলা-পাল্টাহামলায় ওসি মো. মনির হোসেনসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ছাড়া সংঘর্ষে দুই পক্ষের আরও ২৫ থেকে ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
আহতদের মধ্যে শেখপাড়া গ্রামের মুরব্বী ও হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) জামে মসজিদের মোতাওয়াল্লী ফজলু মিয়া, শুয়েব আহমদ, আরিফুল হক রনি ও লতিফুর রহমান মেহদিসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে আহতদের মধ্যে শাহ আব্দুল মান্নান, শাহ আবুল, শাহ সুমন, শাহ বদরুল, শাহ হাসান উদ্দিন, শাহ মাহির, শাহ রাজিব, শাহ সায়েম, শাহ সাদি, শাহ আব্দুর রহিম, শাহ আশিকুর রহমান এপলু, শাহ সাবের, শাহ রাসেল, শাহ ফাহিম, শাহ সাইফ, শাহ আজমল, শাহ আশরাফ, শাহ আবজল, শাহ সাইদ, শাহ তুহিন, শাহ দুলাল, শাহ আলবাব, শাহ ওয়াহিদ, শাহ হারুন, শাহ ইয়াসির ও শাহ নয়নের নামও জানা গেছে।
আহতদের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সংঘর্ষের কারণে চন্ডিপুল-বালাগঞ্জ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সড়কের উভয় পাশে যানজটের সৃষ্টি হয় এবং আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরে মোগলাবাজার থানা পুলিশ, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও মুরব্বিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। নতুন করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) মাজার ওয়াকফ এস্টেটের (ইসি নং-১২৭৩৫) পরিচালনা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত আরও আগে।
গত ২৯ জুলাই ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসনের এক আদেশে মাজার ওয়াকফ এস্টেট পরিচালনার জন্য নয় সদস্যের একটি কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদিত কমিটিতে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিককে সভাপতি, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সহ-সভাপতি এবং মো. ফজলু মিয়াকে মোতাওয়াল্লী করা হয়।
এ ছাড়া আবেদ রাজা ও আহমদুর রহমান ছাদেককে যুগ্ম মোতাওয়াল্লী এবং মোয়াজ্জেম হোসেন লনি, লুতফুর রহমান বাবু, আব্দুল মতিন শাহিন ও আব্দুস সামাদকে সদস্য করা হয়।
ওই কমিটি অনুমোদনের পর শাহ আব্দুল মান্নান বাদী হয়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন নং-১০৭৬৭/২৬ দায়ের করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গত ১৬ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিজয়-৭১ ভবনের ৩ নম্বর আদালতে রিটটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মো. তাজরুল হোসাইনের আদালতে শুনানি শেষে বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসন অনুমোদিত কমিটি বহাল রাখা হয়।
তবে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, কমিটির মোতাওয়াল্লী ফজলু মিয়ার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) মাজার ওয়াকফ এস্টেট ও মসজিদের দায়িত্ব পালনের জন্য আবেদ রাজাকে মোতাওয়াল্লী হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ওয়াকফ এস্টেটের পরিচালনা ও মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব নিয়ে চলমান এই বিরোধের মধ্যেই শুক্রবারের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নতুন করে যাতে কোনো সংঘাতের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আবারও উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা এবং আদালত ও প্রশাসনের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।